বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন

[রাজ্য]

[রাজ্য]

মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের অধিকারের দাবিতে জাঠা

মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের অধিকারের দাবিতে জাঠা

প্রদীপ রায়

photo

পাহাড় থেকে সাগরে, লাল মাটি থেকে সবুজ প্রান্তরে — জাঠা নিয়ে ‘অল ওয়েস্ট বেঙ্গল সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভস ইউনিয়ন’ মাস-ব্যাপী জনতার দ্বারে পৌঁছাবার কর্মসূচি পালন করল। মেকি দেশপ্রেম, উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্ম, জাত-পাত-বর্ণ বিভাজনের উর্দ্ধে উঠে, মেহনতি মানুষের বেঁচে থাকার সংকল্পে এই অভিযান। সেই অভিযানে সামিল হওয়ার আহ্বান ছিল শ্রমিক, কৃষক, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে। নিজেদের সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত শোষক ও শাসকের একমাত্র অস্ত্র যখন বিভাজনের কৌশল, তখন শ্রমজীবী মানুষের আয়ুধ হয়ে উঠুক সার্বিক ঐক্য। সেই লক্ষ্যে এই ‘জাঠা’ অভিযান।
৯ ডিসেম্বর ২০২৫ কোচবিহারে শুরু হয়েছিল ‘জাঠা’ কর্মসূচি। রাজ্যের প্রতিটি জেলায়, শতাধিক পথসভায় ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলির নেতৃত্ব উপস্থিত থেকে ৬ দফা দাবির সমর্থনে বক্তব্য রাখেন। এই ‘জাঠা’ ১০ই জানুয়ারি ২০২৫ কলকাতায় এসে পৌঁছায়। সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে মিছিল করে কলকাতার ধর্মতলা চত্বরে এক সভায় মিলিত হয়। ৬ দফা দাবির সমর্থনে ওই কেন্দ্রীয় সভাতে ভ্রাতৃপ্রতিম কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি ছাড়াও চিকিৎসক, কেমিস্ট, অন্যান্য সংগ্রামী ট্রেড ইউনিয়ন ও গণসংগঠনের নেতৃত্ব জোরালো যৌথ আন্দোলন গড়ে তোলার স্বপক্ষে সওয়াল করেন।
‘জাঠা’ কর্মসূচিতে যে ৬ দফা দাবি তোলা হয়েছে। সেগুলি হল— ১) বীমার চাতুরি নয়, সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা চাই, ২) ওষুধ ও আনুষঙ্গিক ‘ডিভাইস’ থেকে জিএসটি তুলে নাও, ৩) অর্জিত অধিকার কেড়ে শ্রম-কোড চালু করা চলবে না, ৪) অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য পণ্যের দামে কঠোর নিয়ন্ত্রণ চাই, ৫) পেশা সহ সর্বক্ষেত্রে অবিলম্বে ত্রিপাক্ষিক সভা চাই এবং ৬) পেশা সহ সর্বত্র ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে।
দাবিগুলির সমর্থনে জাঠার ট্যাবলোগুলি ছিল যথাক্রমে: এক) বৈষম্য দেদার – মানব জীবনে আঁধার, দুই) ব্যবসায় একচেটিয়াকরণ – ছোট, মাঝারি পুঁজির স্বার্থ হরণ, বেকারির উর্দ্ধগমন, তিন) খাবে কি? জিনিসপত্র অগ্নিমূল্য – দরাজ হাতে বাড়ছে ভোট কেনার মূল্য, চার) ৪৪টি শ্রম আইন থেকে ৪টি শ্রম কোড – কার স্বার্থে, পাঁচ) ৭০০ কৃষকের প্রাণ গেল – কৃষি পণ্যের আইনি ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্য’ নির্ধারণে স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশ মানার প্রতিশ্রুতি কোথায় গেল?, ছয়) স্বাস্থ্য অধিকার না পণ্য?, সাত) ওষুধ শিল্প: দেশি বিদেশি একচেটিয়া পুঁজির আধিপত্য – বাড়ছে ওষুধের দাম, বাড়ছে মুনাফা! বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় এবং আট) রাষ্ট্রীয় মদতে সেলসকর্মীদের উপর বাড়ছে বেনজির আক্রমণ। দীর্ঘ রাস্তায় পথসভাগুলিতে বক্তারা বিষয়গুলির বিশ্লেষণ করেন। প্রতিটি পথসভায় উৎসুক মানুষের ভিড় ছিল লক্ষ্যণীয়। অনেককেই ট্যাবলো ও দাবিগুলির ছবি তুলতে দেখা যায়। এই জাঠা অভিযানে যে সমস্ত দাবি উঠে এসেছে তা কেবল কোনও একটি পেশার শ্রমিকদের বিষয় নয় বরং সমাজের বৃহদাংশ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যন্ত্রণার ছবি।
বর্তমান ব্যবস্থাই যে সম্পদের অসম বন্টন এবং বৈষম্যের জনক তা লুকিয়ে রাখার উপায় নেই। লিঙ্গ বৈষম্য সর্বত্রই চরম। কর্মক্ষেত্রে মজুরি সহ সব বিষয়েই লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার মহিলারা। ‘অক্সফ্যাম’, ‘পিউ রিসার্চ’ বা ‘হুরুন রিপোর্ট’ রোজগার ও সম্পদ আহরণে বিভিন্ন দেশের বৈষম্যের তথ্য প্রকাশ করে চলেছে। উত্তর ও দক্ষিণ বিশ্বের মধ্যে সম্পদের ফারাক আকাশ-পাতাল। সরকারের মদতে শেষ দশকে দেশে গুটি কয়েক ব্যক্তি মালিকের সম্পদের অবিশ্বাস্য বৃদ্ধি হয়েছে। অন্যদিকে, বৃহদাংশ জনগণ বেঁচে থাকার সংস্থান করতে হিমসিম খাচ্ছেন। বৈষম্যের খতিয়ান রাখা ছিল জাঠা-যানে। বিত্তশালী ১ বা ১০ শতাংশের তুলনায় নীচের ৫০ শতাংশের অতি নগণ্য বার্ষিক রোজগার বা সম্পদের তথ্য, বৈষম্যের বিষম চেহারা তুলে ধরা হয়।
নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সময়ে দেশে দেশে মুদ্রাস্ফীতির নিরিখে প্রকৃত মজুরির নগণ্য বৃদ্ধি এবং ভারতে যথাযথ ন্যূনতম মজুরি বিষয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সরকারের হিসেবের গরমিল নিয়ে সরব ছিল জাঠা। কেন্দ্রীয় সরকার ‘ফ্লোর-লেভেল ওয়েজ’ নামে এক বিচিত্র মজুরি (দিন প্রতি ১৭৮ টাকা) চালু রেখে মালিকদের মদত দিচ্ছে। আর এ রাজ্যে, সরকার নির্বিশেষে দীর্ঘ ৩৮ বছর আন্দোলন করেও মেডিক্যাল সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভরা ন্যূনতম মজুরি আদায় করতে পারেনি। সরকার ধূর্ততার সঙ্গে দেশে নিয়োগের অগ্রগতি ঘটেছে বলে গলা ফাটাচ্ছে। অথচ, বিগত পাঁচ বছরের (২০১৯–২৩) এই সংক্রান্ত সাম্প্রতিক সমীক্ষায় (CMIE) প্রকাশ পেয়েছে যে, মাস-মাইনের কর্মী সংখ্যা ২০১৯ থেকে ২০২৩-এ ধারাবাহিক ভাবে কমছে (২৩.৮% থেকে কমে ২০.৯%); ক্যাজুয়াল কর্মী সংখ্যাও তথৈবচ, (২৪.১% থেকে কমে ২১.৮%)। কেবল স্বনিযুক্ত কর্মীর সংখ্যা ক্রম-বর্ধমান (৫২.১% থেকে বেড়ে ৫৭.৩ শতাংশ%)। চাকরি না পেলে স্বনিযুক্ত ‘কাজ’ করা ছাড়া বেঁচে থাকার আর কোনও উপায় থাকছে না।
নতুন শ্রম কোডের বিভিন্ন অংশে মজুরি, ন্যূনতম মজুরি, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, শ্রম-ঘন্টা বিষয়ে মালিকদের যথেচ্ছ ছাড় দেওয়া হয়েছে। ৪৪টি শ্রম আইনকে মাত্র ৪টি শ্রম-কোডের মধ্যে ঢুকিয়ে, ১৫টি আইনকে অন্যান্য আইনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্জিত অধিকারের আইন ও ধারাগুলি কার্যত বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। শ্রম কোডে ছাঁটাই, লে-অফ, বেনচিং, লক-আউট, ক্লোজার ইত্যাদিতে সরকারের ভূমিকা প্রায় অন্তর্হিত। ইউনিয়ন গঠন করা এবং ধর্মঘটের অস্ত্রকে জটিল ও খর্ব করা হয়েছে। শ্রম আইনগুলির লঘু করা কার্যত শ্রমের বাজারকে অসংগঠিত ও মালিক শ্রেণীর যথেচ্ছাচারের ঠেলে দিয়েছে। মেডিক্যাল ও সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভদের জন্য আইন, Sales Promotion Employees (conditions of service) Act (SPEA)-1976 অন্যত্র মিশে যাওয়ায় চাকরি জীবনে প্রাপ্য মোট ছুটির পরিমাণ কাটছাঁট হয়েছে ৫০ শতাংশ; ছুটি বিক্রির পরিমাণ ৭৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। আগের নিয়োগপত্রের নির্দিষ্ট ‘ফরম্যাট’ পরিবর্তিত হওয়ায় মাস-মাইনের বার্ষিক বৃদ্ধির পরিমাণ ঘোষণার দায় থেকে মালিক মুক্তি পেয়েছে। এমনকি কর্মচারীদের চাকরি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য রাখার দায়-মুক্তিও ঘটেছে। ক্রমবর্ধমান বেকার বাহিনী, ‘হায়ার এবং ফায়ার’ নীতি ও পুনরায় নতুন চাকরির সংখ্যা বৃদ্ধির এই পঙ্কিল-চক্র ব্যবস্থা, মালিক ও সরকার উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করছে। সেলস পেশায় আইন আছে, ওয়ার্কিং রুলস নেই। ত্রিপাক্ষিক কমিটির মিটিং ডাকতে সরকার আগ্রহী নয়। ফলে মালিকের ফরমানই ওয়ার্কিং রুলস। উদয়াস্ত কাজের দস্তুর ক্রমান্বয়ে চেপে বসছে।
এই পরিস্থিতিতে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যের বিনিয়ন্ত্রিত মূল্য বৃদ্ধি সাধারণের জীবনে অশেষ দুর্গতি বয়ে এনেছে। পাশাপাশি খাদ্য দ্রব্য তৈরির কারিগর কৃষকেরা ভালো নেই। ঋণের দায়ে কৃষকের আত্মাহুতি রোজকার বাস্তব। অথচ স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশ মেনে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য আইন করতে সরকারের প্রবল অনীহা। ৫০-এর উপর কৃষি আইন তামাদি করে ৩টি আইন প্রবর্তন করে কৃষি ব্যবস্থা কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সরকার। ৭০০র বেশি কৃষকের প্রাণের বিনিময়ে আইন লাগু না করা ও এমএসপি-র প্রতিশ্রুতি আদায় হলেও সরকার নিশ্চুপ। দাবি আদায়ে আবার পথে কৃষকরা। অথচ বিভিন্ন ‘শ্রী’, ‘বেটি-বহিন’ ‘যুবা’ ইত্যাদি নামে যে ভাবে ‘ডোল’ বা ‘রেউড়ি’ ক্রমাগত বাড়ছে তা রীতিমতো হাস্যকর। অথচ সদ্য প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর আমলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কাজ-রোজগার ইত্যাদি বিষয়ে মানুষের অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল। সেই অধিকারের প্রেক্ষিতকেই সরকার টুঁটি চেপে মারতে চাইছে।
এই জাঠা কর্মসূচিতে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খরচে সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা উঠে এসেছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার বেসরকারিকরণ, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলি গুটিয়ে নেওয়া, পাশাপাশি ওষুধ, প্যাথলজি, রোগ নির্ণয়ে বা নিরাময়ে ডিভাইস ব্যবহার ইত্যাদিতে সরকার জিএসটি ধার্য করায় চিকিৎসা খরচ বেড়ে চলেছে। মালিকদের স্বার্থে সরকার ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রায় তুলে দিয়েছে।
১) সরকার ওষুধের দাম নির্ধারণের পূর্ববর্তী ‘কস্ট-বেসড’ ব্যবস্থা বদলে ‘মার্কেট-বেসড’ করেছে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণহীন বাজারই ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করবে।
২) জাতীয় ‘অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ তালিকা’ (NLEM) অন্তর্ভুক্ত ওষুধগুলির দাম নিয়ন্ত্রণ করে ‘ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যালস প্রাইসিং অথরিটি’। অতিমারির পরে একদফায় এই তালিকাভুক্ত ওষুধের দাম বাড়ানো সত্ত্বেও, বিগত তিন বছরে প্রায় ৪১টি ফর্মুলার ওষুধের দাম কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে।
৩) এছাড়াও অত্যাবশ্যকীয় তালিকার বাইরে ওষুধের হাজার হাজার ফর্মূলেশনের দাম, প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বাড়াবার অনুমোদন সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে ওষুধ কোম্পানির মালিকেরা।
সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনের ৮৫ শতাংশই এই ধরনের ওষুধ। ফলে ওষুধ ব্যবসায় মুনাফা লাগামহীন। গত বছরে কেবল প্রথম ১০টি ওষুধ কোম্পানি মুনাফা করেছে সম্মিলিত ভাবে ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই প্রবণতা বিশ্বের সর্বত্র। প্রথম স্থানাধিকারী ওষুধ কোম্পানির PFIZER এর মুনাফা অকল্পনীয়— গত বছরে প্রতি সেকেন্ডে ৯৯৪.৮০ ডলার!
সরকার এই বিষয়টি সামলাতে যে পথের পথিক সেখানে ব্যবসায়ীদের স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল এবং বেসরকারি বীমা কোম্পানীগুলির ফাঁদে সাধারণের ‘কর’ সমৃদ্ধ সরকারি কোষাগারের ক্ষয় হচ্ছে এবং চিকিৎসা করতে রোগীর ‘আউট অব দি পকেট এক্সপেন্স’ টাকার অঙ্কে বেড়েই চলেছে।
সাধারণ মানুষের রুটি রুজির দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান নিয়ে জাঠা চষে বেরিয়েছে রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণে, পশ্চিম থেকে পূর্বে। মেহনতি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার প্রয়াসে গ্রাম-গঞ্জ, শহরতলী-শহরের আনাচে কানাচে। জাঠা কর্মসূচি যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছে বলা যায়।

Copyright © 2021 - 2022 Shramajeebee Bhasha. All Rights Reserved.