বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
শ্রমজীবী ভাষা, ১ মে, ২০২২— জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মেটলি ও নাগরাকাটা এই তিনটি ব্লকের মধ্যে ডুয়ার্সের প্রায় ৪৬টি চা বাগান রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে বেশির ভাগ বাগানই এখন ধুঁকছে বা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে আর কিছু একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে ৮/৯ বছর ধরে। যেগুলো ভাল চলছে তার সংখ্যা হাতে গোনা এবং তার সবগুলোই গুডরিক কোম্পানির পরিচালিত বাগান। চা শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা যেমন মজুরি, বীমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন, স্বাস্থ্যপরিসেবা ও শিক্ষা এইসব বিষয়ে এরা কিছুটা হলেও নজর রাখেন কিন্তু বাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ চা বাগান বা বন্ধ চা বাগানগুলিতে শ্রমিকদের অবস্থা শোচনীয়, মহিলাদের অবস্থা আরো খারাপ। শিশুশ্রম, পাচার যত্রতত্র। যদিও স্প্যানের দীর্ঘদিনের কাজের সুফল হিসাবে মানুষ ও প্রশাসন এখন যথেষ্ট ওয়াকিবহাল এবং তৎপর। যুবদের নেতৃত্বে পাচারকারীরা এখন আর তেমন সুবিধা করতে পারছে না, অনেকে ধরা পড়ে হাজতবাস করছে। উদ্ধার হয়েছে বহু শিশু তাদের বেশিরভাগই শিশু কন্যা। আজ তারা স্কুলমুখী ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি ও কারিগরি প্রশিক্ষণের আওতায় এসেছে।
মহিলা চা শ্রমিকেরা নানাভাবে বঞ্চনা ও অসাম্যের শিকার। পুরুষদের থেকে অনেক ক্ষেত্রেই মহিলাদের কাজে দক্ষতা ও নৈপুণ্য বেশি হলেও স্থায়ী শ্রমিকরা দিন প্রতি ২৬০ টাকা মজুরিতে ৮ ঘন্টা সকাল সাতটা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত কাজ করেন দিনে ২৫ কেজি পাতা তোলার শর্তে। অস্থায়ী বা ক্যাজুয়াল হিসাবে যারা কাজ করেন তাদের একই সময়ে একই কাজের জন্য মাত্র ১৫০ টাকা দিন প্রতি দেওয়া হয়। দিনে ২৫ কেজি চা পাতা তুলতে না পারলে যত কেজি কম তুলবে, কেজিতে ৫/১০ টাকা মজুরি থেকে কেটে নেওয়া হয় স্থায়ী বা অস্থায়ী উভয় শ্রমিকের ক্ষেত্রেই। পাতা তোলা ছাড়াও বাগানের যাবতীয় কাজ মেয়েরাই করে কোনও বাড়তি মজুরি ছাড়াই। উচ্চ পদের কাজগুলো পুরুষদের জন্যই বরাদ্দ, তারা শুধু দেখভাল করেই খালাস। তার উপর আবার রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে আরো সুবিধা, কাজ না করেই ঘরে বসে মজুরি পেয়ে যায়।
বাগানে দীর্ঘ সময় ধরে কোমরে দড়ি বেঁধে পিঠে বড় ঝুড়ি নিয়ে চা পাতা তোলার কষ্টদায়ক শ্রমে মহিলা শ্রমিকদের নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়। লিভারের নানা সমস্যা, কোমর ও মেরুদণ্ডের সমস্যা, তাছাড়া চা গাছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিতে গিয়ে অনেক সময়ই তাদের শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা দেখা দেয় যার জন্য কোনও চিকিৎসা ব্যাবস্থা বাগানে নেই। এমনকি প্রসূতি মহিলাদের জন্যও কোনও স্বাস্থ্যপরিষেবার ব্যবস্থা বাগান কর্তৃপক্ষ করে না। তাদের বহু দূরের ব্লক হাসপাতালে যেতে হয় গাড়ি ভাড়া করে। তাছাড়া মাতৃত্বকালীন কোনও ছুটির ব্যবস্থাই তাদের নেই।
দুর্দশার এখানেই শেষ নয়। বাগানের নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক পরিবার থেকে দু’জনকে কাজ দেওয়া হতো, কিন্তু কোভিডের পর থেকে দু’জনের বদলে এখন একজনকে স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে বাগানে কাজ দেওয়া হচ্ছে। পরিবারের অন্তত এক জনের কাজ না থাকলে পরিবারটিকে চা বাগানে থাকার কোনও জায়গা দেওয়া হয় না। এই পরিস্থিতিতে বাড়িতে বাগানে কাজ করার মতো কোনও সদস্য বা সদস্যা না থাকলে সেক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে বাড়ির ১২/১৩ বছরের শিশুটিকেও দৈনিক মাত্র ১২০ থেকে ১৬০ টাকা মজুরিতে বাগানের কাজে সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত নিয়োগ করা হয়। যে বাগানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে সেখান থেকেও শিশুদের অন্য বাগানে ওই সামান্য মজুরিতে কাজের জন্য গাড়ি এসে কাজে নিয়ে যায় সকাল ৬টায় আর বিকাল ৫টায় নামিয়ে দিয়ে যায়। ভাঙ্গাচোরা স্কুল বাড়ি হয়তো আছে বটে, সেখানে কিছুই হয় না। শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্য নেই, উপযুক্ত কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই— পরিবারে নেশাই যেন মুক্তির পথ। শিশু শ্রম ও পাচারের শুরুও এই পথ ধরেই।
বংশ-পরম্পরায় চুক্তিবদ্ধ বা হিন্দিতে ‘বান্ধয়া মজদুর’ হিসাবে কাজের ভিত্তিতে বাসস্থান, এই শর্তে চা বাগানে শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। কিন্তু দক্ষতা অনুযায়ী শ্রমের মর্যাদা নেই, বঞ্ছনা ও নিপীড়নের শিকার অহরহ আর অসাম্য প্রতিনিয়ত। এর সঙ্গে ভবিষ্যনিধি বা পিএফ এর জমা টাকারও কোনও হিসাব থাকে না কোনও শ্রমিকের ক্ষেত্রেই। পিএফ এর টাকা জমা দেওয়ার কোনও রশিদ দেওয়া হয় না কোনও শ্রমিককে, ফলে কার কত টাকা পিএফ এ জমা আছে তার কোনও হিসাব তারা জানেন না। প্রাপ্য টাকা থেকে প্রায় অর্ধেক টাকা মাত্র স্থায়ী শ্রমিকরা হাতে পান অবসরের সময়। সবাই জানেন বাগানের ম্যানেজার এবং পিএফ অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী ও পিএফ বাবুদের মিলিত ষড়যন্ত্রের শিকার তারা। বাগানের শ্রমিকদের রক্ত জল করা হকের টাকার অর্ধেকটাই তারা হজম করে নেয়। বাকি কিছু টাকা দয়া করে শ্রমিকদের পিএফ হিসেবে দেওয়া হয়, যার কোনও সঠিক হিসেব মেলে না। জীবনের হিসাব মেলাতেই যাদের প্রতিনিয়ত কঠিন লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে হয়, পিএফ এর হিসাবের খাতা মেলানোর দায় তারা ওই পিএফ বাবুর হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন বাধ্য হয়ে। তবুও প্রশ্ন যে ওঠে না মাঝে মাঝে তা নয়, তোলে অনেকে, বাগানের কিছু শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা, কিন্তু পিএফ বাবুর বকুনিতে আবার সব শান্ত হয়ে যায়। সঠিক তথ্য যে এদের কাছে নেই, আর নেই জোটবদ্ধ সঙ্কল্প।
আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের চা ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, চীন, কেনিয়া চায়ের বাজার ধরে নিচ্ছে। ওইদেশগুলি বিশ্বের বাজারের চাহিদা অনুয়ায়ী পরিমাণ ও গুণগত মানের চা যোগান দিচ্ছে। এর পিছনে আভ্যন্তরিণ সমস্যাও অনেকটা দায়ী যা অনেকটাই রাজনৈতিক ও পরিকাঠামোগত। এছাড়াও রয়েছে বাগান মালিকদের অনৈতিক কাজকর্ম, শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার প্রতি চরম উদাসীনতা ও উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে চায়ের গুণগত মান হ্রাস এবং বাগান পরিচালনায় প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব। তার সঙ্গে দক্ষ শ্রমিকের অভাব চা বাগানে। উপযুক্ত মজুরি ও শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের কোনও রকম সদর্থক হস্তক্ষেপ না থাকায় পরবর্তী প্রজন্ম আর এই পেশায় আসছে না, বাগান ছেড়ে তারা আজ কাজের সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি দিচ্ছে। নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়ুল মারছি, সরকার দেখেও না দেখার ভান করে আছে।
সামসিং, মেটেলি ব্লক, জলপাইগুড়ি জেলা
অনুলিখন: পার্থ ভট্টাচার্য