বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
রোজ ৪৮০ টাকায় রেলের পাত তৈরির কাজ গত মাসে অর্ধেক দিন হয়েছে। এই নিয়ে চিন্তায় রজত (নাম পরিবর্তিত), আগামী দিনগুলোয় কাজ পাবেন কিনা, সংসার চালাবেন কী ভাবে, তা জানা নেই। অন্যত্র ‘ভাল’ কাজের খোঁজও করছেন। তবে রজত একুশ বছর বয়স থেকে কাজ শিখেছেন চটকলের ‘তাঁত’ বিভাগে, দু’টি করে পুরোনো ‘মোটা’ তাঁত চালাতেন। ২০১২ সালে নাম-নম্বর (অস্থায়ী ‘নিউ এন্ট্রান্স’ শ্রমিক) পেয়েছেন। বর্তমান বয়স চল্লিশ, গত ১৩ বছর ধরে মিলের ভেতরে অস্থায়ী (নিউ এন্ট্রান্স) হিসেবে একজন দক্ষ-শ্রমিকের কাজ করেন। গত বছরে এপ্রিল মাসে কারখানায় ত্রিপাক্ষিক চুক্তি (২০২৪) লাগু হওয়ার পদ্ধতি শুরু হয়, পুরোনো ‘তাঁত’ (মোটা, হাঁসিয়া) উপড়ে ফেলে নতুন ‘তাঁত’ (S4A loom) বসতে শুরু করে। সেই সময় থেকে চালু হয়, পুরোনো তাঁতের (মোটা, হাঁসিয়া) শ্রমিকদের বিভাগ ‘বদলি’, নতুন তাঁত (S4A loom)-এ কাজ শেখানোর অনৈতিক হয়রানি ও স্বল্প মজুরিতে ছ’টি করে নতুন ‘তাঁত’ (S4A loom) চালাতে বাধ্য করার প্রয়াস। যা রজত (পরিবর্তিত) সমেত আরও অনেক শ্রমিকের জীবনকে চটকলের অন্ধকারের চার দেওয়ালের বাইরে এনে দাঁড় করায়। তবুও আলো ফেরেনি কারোর জীবনে। এখন শুধুই ঠিকাদারের কথায় উঠা-বসা, দিনরাত এদিক-ওদিক ছোটা, আলোর সন্ধানে স্বল্প মজুরিতেই ৯-১২ ঘণ্টার কাজ করার অংকের হিসেব মেলানোর পালা।
রজতের ‘চটকলিয়া’ বন্ধু মাফুজ (নাম পরিবর্তিত), একই কারণে একই সঙ্গে অলিখিত-ছাঁটাই হয়েছিলেন, ছ’টি নতুন ‘তাঁত’ (S4A loom) না চালাতে পেরে। তখন থেকে সে-ও পেটের টানে প্রাণের মায়াকে ঠিকাদারের কাছে বন্দক রেখে অন্যান্য চটকলের রাতের শিফটে ‘ভাউচার’ কোটার ঝুঁকিপূর্ণ কাজে দক্ষ-শ্রমিকে পরিণত হন। যেদিন রাতে কাজ পান, পর দিন ভোর ছ’টা শিফট শেষে ৫১০ টাকা পকেটে পুরে, পুনঃরায় সেদিন রাতে কাজ না পাওয়ার অনিশ্চয়তা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। চটকলের এমনি আরও অনেক শ্রমিক ঠিকাদার সংস্থার বেড়াজালে জড়িয়ে কয়েক মাসের চুক্তিতে বাইরের রাজ্যে গিয়েছিলেন। আশা ছিল মাসিক কুড়ি হাজার টাকা রোজগারের। সময় শেষের আগেই ফিরে এসেছেন খরচের চাপ কুলোতে না পেরে। এঁদের মধ্যকার একজন শ্রমিকের স্ত্রী জানান, ঋণ নেবেন, হাঁট থেকে কাপড় কিনে এনে বেচবেন, তবুও আর বাইরে যেতে দেবেন না স্বামীকে। বাকিরা এখন ঠিকাদারের কাছে জীবনকে বাজি রেখে চটকলের রাতের শিফটে ‘ভাউচার’ কোটায় পুরোনো ‘তাঁত’-এ স্বল্প মজুরির বিনিময় দক্ষ-শ্রমিকের কাজ করছেন।
আক্ষেপ, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এমনি অবস্থা রাজ্যের সর্ব বৃহৎ শ্রমনিবিড় চটশিল্পের সিংহভাগ শ্রমিকের। এখন রাজ্যের চটকলগুলিতে সরাসরি ছাঁটাই হয় না। নতুন পদ্ধতিতে ছাঁটাই করা চালু হয়েছে। স্পিনিং থেকে পাটঘর সহ নানা বিভাগের অনেক শ্রমিকেরা নিজেরাই কাজের চাপে অসহ্য হয়ে, কাজ না করতে পেরে স্বেচ্ছায় বসে যান। আবার কুড়ি-পঁচিশ বছর কাজ করবার পর এখন দক্ষ-শ্রমিকের কপালে নতুন ফাঁড়া ঝুলছে; বিভাগ বদলি, নতুন তাঁত (S4A loom) কাজ শেখা ও স্বল্প মজুরিতে ছ’টি তাঁত চালানো, উৎপাদনের বাড়তি লক্ষ্য মাত্রা পূরণ করার প্রবল চাপ। পূরণ না হলেই শোকজ নোটিশ, বসিয়ে দেওয়া হয় কাজ থেকে। শ্রমিকেরা এইভাবে অলিখিত-ছাঁটাই হচ্ছেন। পেটের টানে পরিণত হচ্ছেন অন্যান্য ছোট, মাঝারি বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের ঠিকা শ্রমিকে। অথবা বেশিরভাগই থেকে যাচ্ছেন চটকলেরই রাতের শিফটের ঠিকা ‘ভাউচার’ শ্রমিকে। ঠিকাদারের হাতের মুঠোয় শ্রমিকের জীবন বন্দি। তাই আজ কাজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে, এ কথা জানিয়ে দেন ঠিকাদারদের দল।
কাজের পরিবেশের উন্নয়ন, আধুনিকীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা বিধি, ঠিকাদার আইন — এসব শ্রমিক স্বার্থ কাগুজের পাতাতেই শোভা পায়। ২০২২ সালে দিল্লি হাই কোর্টের নির্দেশ ছিল, রাজ্য-কেন্দ্র সরকারকে ঠিকা আইনে (১৯৭০) শ্রমিক নিয়োগের সুষ্ঠু নীতি নির্ধারণ করতে হবে। তা হল কই? বরং, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে হনুমান চটকলে রাতের শিফটে দুর্ঘটনায় কয়েক জন ‘ভাউচার’ শ্রমিক নিহত হলেন। ২০২৩ সালে শ্রীরামপুরের দিল্লি রোডের ছাঁট লোহার কারখানায় বিস্ফোরণের কবলে পড়ে দু’জন ঠিকা শ্রমিক প্রাণ হারান। ২০২৪ সাল, কাজ থেকে অলিখিত-ছাঁটাই হয়ে জীবন থেকে ছাঁটাই হলেন ওয়েভারলি চটকলের শ্রমিক। সেই বছরে একই কারণে, অম্বিকা চটকলের আরও দু’জন শ্রমিকের প্রাণ যায়। গোটা দেশ জুড়ে দেখতে গেলে এই রকম ভুরিভুরি উদাহরণ রয়েছে। এ দেশে শ্রমিকের প্রাণ যাওয়ার সঠিক হিসেব রাখাটাই কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোলা বাজারে পণ্যের বিক্রির অংকের দরকষাকষিতে ঠিকা শ্রমিকের প্রাণ বাড়ে-কমে, ঠিকাদারের দল নিশ্চিন্তে শ্রমিকের প্রাণ বেচার কাজ করতে পারে।
চুক্তি শ্রমিক আইন (১৯৭০) অনুসারে, যে ঠিকাদার সংস্থা কুড়ি জনের বেশি শ্রমিক নিয়োগ করবে তাদের সর্বক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। ঠিকা শ্রমিককে স্থায়ী শ্রমিকের মাপের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা বিধি, কাজের অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। কেন্দ্র সরকারের নতুন শ্রম বিধি এটিকে বদলিয়ে ‘তিনশো জন শ্রমিক-কর্মী’তে এনে দাঁড় করিয়েছে। আইন ক্রমশই সরাসরি শ্রমিকের বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছে। নব্বইয়ের দশক থেকে চটকলে, প্রথমে ভাগা-শ্রমিকের (যে বা যারা অর্ধেক মজুরিতে অন্যের নম্বরে কাজ করতেন) আবির্ভাব। পরে ২০০২ সালের ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে ‘ন্যূনতম মজুরি’র অত্যাধিক নিম্নমুখী হওয়ায় চটকলের দক্ষ-শ্রমিকদের ঠিকা প্রথার ‘ভাউচার’ কোটার শ্রমিকের দিকে ঠেলে দেয়। কাজ শেষে দিন প্রতি সামান্য কিছু বেশি ‘ক্যাশ’ বা ‘কাঁচা’ টাকা রোজগারের তাড়নায়। সময় যত গড়ায় মূল্যবৃদ্ধি বাড়তে থাকে, চটকলের ‘ভাউচার’ কোটার শ্রমিকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। এখন অধিকাংশই চুক্তি ভিত্তিক অস্থায়ী (নিউ এন্ট্রান্স) ও ‘ভাউচার’ শ্রমিক, এমনটাই অভিযোগ, শ্রমিক সংগঠনগুলির। তবে এরা নতুন শ্রম বিধির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আশ্বাসটুকু দিলেও চটশিল্পের এমন গভীর অসুখ নিয়ে নীরবতা পালন করছে। সিংহভাগ চটকলগুলির বহু বিভাগ আলাদা-আলাদা ঠিকাদার সংস্থাগুলি চালনা করে। নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ছয় মাস কাজ শেখবার পরে শ্রমিককে ‘নাম-নম্বর’ দেওয়ার কথা বলা রয়েছে। কাজ শেখার মেয়াদ সর্বোচ্চ ছয় মাস ফুরানোর পরে আরও দেড় বছর ‘ভাউচার’-এ কাজ করে শ্রমিকেরা যখন হাজিরার (মাস্টার রোল বা নিউ এন্ট্রান্স শ্রমিকের খাতায় নাম তোলা বা মিলের নম্বর যুক্ত শ্রমিক) হওয়ার কথা বলছেন, তখন পরদিন কাজ না থাকবার হুমকি আসে। ন্যূনতম প্রতিবাদ করলে শ্রমিকের বাড়িতে পুলিশ পৌঁছে যায় মধ্য রাতে।
চটকল এখন শ্রমিকের জীবনে ‘মরণের চার দেওয়াল’ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই বিভাগ বদলি, কাজের চাপ ও অলিখিত-ছাঁটাইয়ের জাঁতাকলে প্রাথমিকভাবে শ্রমিকের জীবন ঠিকাদারের শিকার। শ্রমের বাজারেও মজুরির মান তলানিতে ঠেকেছে, বাজারে স্বল্প মজুরির শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। ‘নতুন ভারত’-এ শ্রমিকের জীবন যে ক্রীতদাসদের থেকে আলাদা, বোঝার উপায় নেই। পুঁজি, বিকাশমান পর্যায় নিজ দেশ, অঞ্চলের সামন্ততন্ত্রের যাবতীয় কাঠামোগুলিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছিল। যখন ‘উন্নয়ন’ বা ‘সভ্য’ করে তোলবার আছিলায় পুঁজির রপ্তানি ও আমদানি পদ্ধতি চালু হল তখন থেকে ভারতের মতো দেশগুলিতে সামন্ততন্ত্রের অবশেষগুলিকে আঁকড়ে রেখে পুঁজির লুণ্ঠন গতি পেয়েছে। সেই লুণ্ঠনের স্বার্থের অন্যতম হাতিয়ার এই ঠিকাদারি ব্যবস্থা। যার কু-প্রভাব বিশ্বায়ন পরবর্তী সময় জুড়ে সর্বক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে পড়েছে। এর প্রচলন ভারতে ১৮৫৭ সালের পরের সময় থেকে শুরু হয়, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ প্রত্যক্ষ ক্ষমতায় আসবার ফলে। শুরুর সময় থেকে শহরের এই ঠিকাদারদের দল গ্রামের ফড়ে, পাটের কালোবাজারি বা জমিদারিতন্ত্রের সঙ্গে আঁতাত করে চলে। অথবা এর অংশ হিসেবে কাজ করে। এই ঠিকাদার সংস্থা বা ফড়ে বা পাটের কালোবাজারির মাথারা নানা উপায়ে অসাধু পদ্ধতির বাজার বহির্ভূত শোষণের মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণে ফাটকা মুনাফা লুঠ করেই পরর্বতী সময়ে বিভিন্ন ছোট, মাঝারি কারখানার মালিক হয়েছেন। আজ ফড়ে ও পাটের কারবারিরাই অধিকাংশ চটকলেরই মালিকে পরিণত হয়েছেন।
সমাজের এমন ভয়ানক গভীর অসুখের কবল থেকে চটশিল্পের না বাদ পড়াই স্বাভাবিক। ফলে আজ কাজ আছে, কাল নেই — এটির পাল্লা অন্যান্য ক্ষেত্রের পাশাপাশি চটকলেও প্রতিদিন রাজনৈতিকভাবে ভারী হয়েছে বা ক্রমশ আরও ভারী হচ্ছে। যদিও বা ‘নব্বই শতাংশ শ্রমিকের স্থায়ীকরণ হবে’, এ কথা ২০২৪ সালের চটকল ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে ‘কুড়ি বছর কাজ করার পরে একজন শ্রমিকের স্থায়ীকরণ’ প্রসঙ্গে রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন বছর খানেক বাদে এই বিষয়ে কোনও সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা সঠিকভাবে তদন্ত প্রক্রিয়া চালালে ঠিক এর উল্টো ছবি উঠে আসবে। ঠিকা শ্রমিকের সংখ্যা দৈনন্দিন বাড়ছে, শ্রমিকের জীবন সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে গেছে, তাও পরিষ্কার হবে। তবে এই রকম অলিখিত-ছাঁটাই হওয়া বেশিভাগ শ্রমিকেরা মাঝ জীবনের এমন কঠিন সংগ্রাম থেকে পালিয়ে যেতে নারাজ। একত্রিত হয়েছেন, লড়াইয়ের চেষ্টা করছেন। শিল্প, শ্রমিক তথা গোটা সমাজের আলোর সন্ধান এখানেই রয়েছে।