বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
শ্রমজীবী ভাষা, ১ আগস্ট, ২০২২— একটা একটা করে লাঠি ভাঙ্গা সহজ, কিন্তু এক গুচ্ছ লাঠি এক সঙ্গে ভাঙ্গা কঠিন। সংগঠিত হওয়ার গুরুত্বই আলাদা। শ্রেণী আন্দোলনের ইতিহাস এই কথাই বলে।
দেশ ও রাজ্যে পেশাভিত্তিক শ্রেণী বিন্যাসের পরিসংখ্যানে নজর করলে দেখা যায় কৃষিজীবীদের মতো পরিবহন শ্রমিকদের বিশাল ব্যাপ্তি। শুধু সংখ্যাতেই নয় পেশা হিসাবে কৃষক ও পরিবহন শ্রমিকের সৃষ্টিকালও প্রায় সমসাময়িক। মহাভারতের আদিপর্বে যান ও বাহনের কথা প্রমাণ করে এই প্রাচীনত্ব।
অন্নদাতা কৃষকদের ঐতিহাসিক সংগ্রাম জয়যুক্ত হল। কারণ তারা সংগঠিত হতে পেরেছিলেন। তাহলে পরিবহন শ্রমিকরা পারবে না কেন? দেশে চার রকমের পরিবহন পরিষেবা রয়েছে। বিমান, রেলপথ, জলপথ ও সড়কপথ। শিল্প হিসেবে পরিবহন একটি কোর সেক্টর। পরিবহন শ্রমিক আন্দোলনের রাষ্ট্র বা শাসকদের আঘাত করার ক্ষমতা রয়েছে। বেশ কিছু দেশে পরিবহন শ্রমিক আন্দোলন সেই দেশের সরকার পরিবর্তন করেছে। আমাদের দেশে পরিবহন শ্রমিকদের সমস্যা হল তারা আজও সংগঠিত নয়। তাই সরকার তাদের গুরুত্ব দেয় না। শাসক ও শোষকরা চায় এই পরিস্থিতির স্থিতাবস্থা। সমাজ জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসাবে পরিবহন শিল্প থাকলেও এই ক্ষেত্রের শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, চিকিৎসা বীমা ইত্যাদি অনেক কিছু ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত। রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের উত্তরকালে মিশ্র অর্থনীতির জমানায়, ১৯৯০ সালের আগে পর্যন্ত পরিবহন শ্রমিকদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য থাকলেও একে পরিষবা হিসাবে দেখা হতো। পরবর্তী কালে নয়া উদারনীতির পর্বে শাসক শ্রেণী এই শিল্পকে পুরোপুরি কর্পোরেট মুনাফার ক্ষেত্র বানাতে চায়। এর আগে পরিবহণে বেসরকারি ও ব্যক্তিপুঁজির পাল্লা ভারী থাকলেও রাষ্ট্রের হাতেও ছিল কিছু নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রিত আকারে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পরিবহন। তাই শ্রমিকদের একটা অংশ সুখে না থাকলেও স্বস্তিতে ছিল। যদিও ধনতন্ত্র তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী রাষ্ট্রের হাত থেকে পরিবহন ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করে বাজারের পণ্য করার জন্য কর্পোরেট সংবাদ মাধ্যম নিরলসভাবে প্রচার করে যাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজকে দেশের গণতান্ত্রিক অবস্থা এবং শাসক শ্রেণীর অবস্থানের বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে।
বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার খোলাখুলিভাবে বহুজাতিক সংস্থাগুলির স্বার্থে দেশের সমগ্র অর্থনীতি ও রাজনীতির শাসন পরিচালনা করছে। আর এই কাজ করতে গিয়ে তারা বেপরোয়াভাবে ব্যবহার করছে রাষ্ট্র ক্ষমতাকে। ইতিমধ্যে পরিবহন আইনের খোল নলচে পালটে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন করেছে এই ব্যবস্থার মধ্যে শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার যেটুকু আইনী রক্ষা কবচ ছিল সেগুলিরও। বর্তমান শাসকরা এখন কর্পোরেট সেবায় উন্মাদের মতো আচরণ করছে। জাতীয় সম্পদ বিমান ও বিমান বন্দর দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। রেলের ক্ষেত্রেও একই পথ নিয়েছে। জলপথে সাম্প্রতিক অতীতে যেটুকু সরকার নিয়ন্ত্রণ ছিল সেটুকুও বিলুপ্তির পথে।
রোড ট্রান্সপোট? সারা দেশে রাস্তার পরিমাণ জাতীয় সড়ক ১ লক্ষ ১৫ হাজার কিমি, রাজ্য সড়ক ও অন্যান্য রাস্তা ৫৭ লক্ষ ৫০ হাজার কিমি। এই রাস্তা সমূহ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকার নিয়ন্ত্রিত বা অধিনস্থ অনেক সংস্থা থাকলেও বর্তমানে সব কিছুই তুলে দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি ব্যবসায়ী এজেন্সি হাতে। ঘোষণা হয়েছে ২৭ হাজার কিমি রাস্তা কর্পোরেটের কাছে বিক্রি করা হবে। ফলে খরচের বোঝা বাড়বে আমজনতার। সকলেই জানেন, এদের একমাত্র পবিত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনেক অনেক মুনাফা। পরিণতি যা হওয়ার তাই হচ্ছে। ২০১৭ সালের হিসাবে সারা দেশে রেজিষ্ট্রিকৃত গাড়ির সংখ্যা ২৫.৩৩ কোটি। ছোট গাড়ি ৬ কোটি, লরি ১ কোটি ২৩ লক্ষ, বাস ১৯ লক্ষ আর মোটর বাইক ১৯ কোটি। সরকারও এই ক্ষেত্রটিকে দেখছে সোনার ডিম পাড়া হাঁস হিসাবে। কেন্দ্রীয় সরকার ইমপোর্ট ট্যাক্স, এক্সাইজ ডিউটি ইত্যাদি থেকে হাজার কোটি টাকা কোষাগারে সংগ্রহ করছে। তার মধ্যে শুধু ডিজেল থেকেই ট্যাক্স তুলেছে ১ লক্ষ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। রাজ্যগুলিও প্রতিনিয়ত ট্যাক্স বাড়িয়ে তাদের ভান্ডার ভরছে। সঙ্গে সঙ্গে সরকারি পরিবহনে যেটুকু ভর্তুকি ছিল তাও তুলে দেওয়া হয়েছে।
২০১৭ সালের হিসাবে আমাদের রাজ্যে মোট রেজিষ্ট্রিকৃত গাড়ির সংখ্যা ৭৪ লক্ষ ৪৫ হাজার। এর মধ্যে সরকারি বাস ২,৫০০, বেসরকারি বাস ৫০ হাজার, লরি ২ লক্ষ ৮০ হাজার, ট্যাক্সি ও ছোট গাড়ি ৫ লক্ষ, অটো ১ লক্ষ, টোটোর কোনও হিসাব নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হবে কৃষিকর্মে ব্যবহৃত ট্রাক্টর যা গ্রামাঞ্চলে পণ্য পরিহনের কাজে যুক্ত।
রাজ্যে পাঁচটি সরকারি পরিবহন সংস্থা যাত্রী পরিষেবায় বাস চালাতো। রাজ্য সরকার সিএসটিসি, সিটিসি, সারফেস ট্র্যান্সপোর্ট করপোরেশন, এই তিনটি পরিবহন সংস্থাকে তুলে দিয়ে ডাব্লুবিটিসি (WBTC) গঠন করেছে। এসবিএসটিসি, এনবিএসটিসি এবং ডাব্লুবিটিসি’কে এক করার নামে তুলে দেবার চেষ্টা চলছে। সরকারি পরিবহন সংস্থাগুলিতে ঢালাওভাবে বেসরকারিকরণ চলছে। বাস-ট্রামের টারমিনাসের জমিও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। বাসের একটি দরজা বন্ধ করে শ্রমিক সংখ্যা হ্রাস, অবসর নেওয়ায় ও ভিআরএস-এর মাধ্যমে বিপদজনকভাবে কমানো হয়েছে শ্রমিক সংখ্যাও। যেটুকু নিয়োগ না হলে চলছে না, সেখানে নিয়োগ হচ্ছে অস্থায়ী ঠিকা শ্রমিক। তাও অর্থের বিনিময়ে। সরকারি পরিবহন সংস্থাগুলিতে মোট শ্রমিক ছিল ১৪৬৬৭— স্থায়ী শ্রমিক ৬৭০১ এবং অস্থায়ী শ্রমিক ৭৯৬৬। সর্বোচ্চ আদালত যাই রায় দিক, এরা সমকাজে সমবেতন থেকে বঞ্চিত। এদের চাকরির নিশ্চয়তা নেই, সামান্য বেতন, বিধিবদ্ধ পাওনা থেকেও উপেক্ষিত। শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে কোনও ন্যায্য পাওনার দাবি জানাতে গেলে সরকার অনুমোদিত ত্রাস ও ভীতি প্রদর্শন। যার ফলে সরকারি পরিবহনের শ্রমিকরা ভয়ানক ক্ষুব্ধ। সবকটি সংস্থায় আন্দোলন গড়ে তুলতে ভয়, ভীতি উপেক্ষা করে শ্রমিকদের সংগঠিত করতে হবে।
বেসরকারি পরিবহণে রাজ্যে প্রায় ৫০ হাজার বাস-মিনিবাস ও প্রায় ৩ লক্ষ মালবাহী ট্রাক, লরিতে ১০ লক্ষ শ্রমিক কাজ করে। কাজ পায় মাসে ১২ থেকে ১৫ দিন। দিনে ১২ ঘন্টা বা তার বেশি শ্রম দেয়। ট্যাক্সি চালকদের অবস্থাও ভীষণ খারাপ। আছে অ্যাপ নির্ভর ‘ওলা’, ‘উবের’, ‘র্যাপিডো’-র মতো যাত্রী বাহন। এখানে অপারেটর ও ড্রাইভারদেরকে সংস্থা কর্তৃপক্ষ শ্রমিক মনে করে না। তাদের পোষাকী নাম পার্টনার, তারা সংখ্যায় ৮ হাজার। আছেন স্কুল বাস, অফিস বাস, পুলকার ও টোটো চালকরা। আছেন অটোমোবাইল সেলস্ ডিলারের কাজে যুক্ত শ্রমিক-কর্মচারী, যারা প্রায় সব শহরে ২ চাকা ও ৪ চাকা গাড়ির শোরুমে সেলস ও সার্ভিসে কর্মরত। এই বিশাল ক্ষেত্রে কোনও শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার আইনই চলে না। কাজ করলে টাকা না হলে নয়। মালিকদের ইচ্ছাই এখানে আইন। লকডাউন পর্বে বেসরকারি পরিবহন শ্রমিকরা সরকারি ঘোষণায় সামাজিক দায়িত্ব পালন করেও ন্যায্য পাওনা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে। তারা কর্মচ্যুত ছিল, মজুরি পাননি। শ্রমিকদের জন্য মাসে ওই সময়কালে ৭,৫০০ টাকা করে দেবার দাবি কোনও সরকারই মানেনি। শ্রমিকরা নিদারুণ কষ্টে দিন যাপন করেছে। আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শ্রমিক আত্মহত্যা করেছে।
পুলিশের জুলুম ছিল বহুদিন ধরে কিন্তু এখন যেন জুলুমটা প্ৰথায় পরিণত হয়েছে। ডিজেলের দামবৃদ্ধি, স্পেয়ার পার্টসের দাম, বীমার খরচ, রোড ট্যাক্সের বোঝা নিয়ে গাড়ি চলছে ৫০ শতাংশ। সকল শ্রমিকের আগের মতো এখন নিয়মিত কাজ নেই। অনেক শ্রমিকই এখন অন্য পেশায় ঝুঁকছে। আমাদের রাজ্যে প্রায় ২০ লক্ষ পরিবহন শ্রমিক কর্মরত।
সারা দেশে গণতন্ত্রকে পদদলিত করে ফ্যাসিবাদের পথে আক্রমণ শানানো হচ্ছে। সংসদে বিরোধীদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে গা জোয়ারী করে একাধিক বিল পাশ করানো হয়েছে। প্রতিরক্ষা শিল্পে ধর্মঘট নিষিদ্ধ করার আইন তৈরি হয়েছে। প্রতিবাদী ও প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের বিনা বিচারে আটক, মিথ্যা মামলায় জড়ানো, ইউএপিএ আইনে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মকে ব্যবহার করে ঘৃণ্য রাজনীতি চলছে জাতীয় পর্যায়ে।
আর রাজ্যের সরকারও স্বৈরশাসন চাপিয়ে দিচ্ছে। সরকারি মদতে গুন্ডা সন্ত্রাস, মিথ্যা মামলা, দুর্নীতি, লুঠের রাজনীতি অব্যহত রয়েছে। বিরোধীদের ট্রেড ইউনিয়নগুলি ও অফিস দখল করা হয়েছে। শাসক দলের ইচ্ছেই এখানে আইন, সংবিধান। সরকার যে ‘ওয়েস্টবেঙ্গল সোশ্যাল সিকিউরিটি স্কীম’-এ টাকা পরিবহন শিল্প থেকে শ্রমিক ওয়েলফেয়ারের জন্য আদায় করে তার সুযোগ পায় না শ্রমিকরা। ওই অর্থের খরচের কোনও হিসাব শ্রমিকদের দেওয়া হয় না। অথচ পথ নিরাপত্তার সমস্ত দায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে শ্রমিকদের ওপরে। ফাইন, জেল নিত্যনতুন ফরমান জারি করা হচ্ছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন শ্রমিকদের সংগঠিত করার উপর শ্রমিক সংগঠন ও সংগঠকদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ এই শ্রমিকদের মাত্র ১০ শতাংশ ইউনিয়নের সদস্য। অথচ মালিকরা কিন্তু প্রায় ৯৫ শতাংশই তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে নিজস্ব সংগঠনে যুক্ত। সেই তুলনায় এই ক্ষেত্রের শ্রমিক-কর্মচারীরা এখনও ইউনিয়নে সংগঠিত হতে বা ঐক্য বন্ধনে সামিল হতে পারেনি। দুঃখের কথা, যাঁরা দেশ ও রাজ্যে গরীব শ্রমজীবীদের জন্য নিবেদিত প্রাণ তাদেরও সকলের মধ্যে এই উপলব্ধিবোধ গড়ে ওঠেনি। দুর্বলতাটা এখানেই। যদি সত্যি সত্যি আমরা দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে কল্যাণ অভিমুখী করতে চাই, তবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য অভিমুখে সলতে পাকাতে হবে। গণতন্ত্রের পক্ষে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শ্রমিকের অধিকারের জন্য তাদের আশু দাবিগুলিকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি চালাতে হবে। লড়াইয়ের জমি পড়ে আছে, তাতে আবাদ করতে হবে।