বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে ২৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হল যে, শাসক দলের এই সাফল্যের অন্যতম কারণ রাজ্যের ৩২ শতাংশ মুসলিম ভোটারের সিংহভাগ তৃণমূল কংগ্রেসের অনুকূলে রায় দিয়েছেন। বিশ্লেষকেরা তাঁদের পর্যবেক্ষণে আরও জানিয়েছেন যে মুসলিম সমাজ নিজেদের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার স্বার্থে প্রায় সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে মুসলিম সমাজ যে, ভয়াবহ বিপন্নতার মুখে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের ছত্রছায়ায় না থাকলে কি নিজেদের জীবন জীবিকা রক্ষা করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেবেন।
আরও একটি গুরুতর বিষয় মুসলিম মানসকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছে। সংখ্যাগুরু সম্প্রাদায়ের এক বড় অংশের মধ্যে মুসলমানদের সম্বন্ধে একটা অবিশ্বাসের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে যা সংখ্যালঘু মানুষের সামাজিক জীবনযাপনে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে দুটি বিষয় সংক্ষেপে আলোচনা করবো যা সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরু সম্প্রাদায়ের বিদ্বেষের উৎস সন্ধানে সহায়ক হবে।
আধুনিক “নেশনের” ধারণা এসেছে প্রধান প্রধান ইউরোপীয় দেশগুলি ১৬৪৮ সালে যে “ওয়েস্টফেলিয়া” শান্তি-চুক্তির করেছিল তার হাত ধরে। এই চুক্তির মাধ্যমে জাতি ভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা, সার্বভৌমত্বের ধারণা, প্রজা থেকে নাগরিক ধারণা গড়ে উঠে। এই “নেশনের” ধারণা থেকে “ন্যাশনালিজম”এর যে বোধ তৈরি হয় তাতে দেশের অধিবাসীদের মধ্যেই কিছু কিছু সম্প্রদায়কে বাইরের লোক বা শত্রু হিসাবে বলে চিহ্নিত করা শুরু হয়। একটা “অপরের” ধারণা জনমানসে প্রথিত করা হয়। রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। পরিতাপের বিষয় হল বর্তমানের ভারত এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের পথিক। দেশের মুসলিম, ক্রিশ্চান সম্প্রদায়ের মানুষরা “অপরের” তালিকায় স্থান পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয়রা মুসলিমদের সহ-নাগরিকের মর্যাদা দিতে পারেনি। রাষ্ট্র সংবিধান অনুযায়ী গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি আদর্শের পথ অনুসরণ না করার ফলেই মুসলমানরা বিপন্নতার শিকার। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তাঁরা তাই ক্ষমতাশীল শাসক দলের ছত্রছায়ায় থাকতে বাধ্য হন।
জনমানসে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে দেশটা ক্রমশ মুসলিম গরিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে চলেছে। পরিসংখ্যানে না গিয়ে চিরাচরিত বুলি হল, মুসলমানদের চারটি বিয়ে, তাই তাদের সন্তান সংখ্যা অনেক।
বহু বিবাহ ধর্ম নির্বিশেষে সর্বধর্মেরই দীর্ঘদিনের বাস্তবতা, কিন্তু তা ক্রমহাসমান। ২০১৯-২০ সালের জাতীয় পরিবার-ভিত্তিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার তথ্যে প্রকাশ হিন্দু, মুসলিম ও অন্যান্যদের বহু বিবাহের হার যথাক্রমে ১.৩, ১.৯ ও ১.৬ শতাংশ। জনসংখ্যাবৃদ্ধির হারও সব সম্প্রদায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। মহিলাদের গর্ভধারণের হার (fertility rate) হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে লক্ষ্যণীয়ভাবে কমেছে — হিন্দু মহিলার ক্ষেত্রে ১.৯ শতাংশ ও মুসলিম মহিলার ক্ষেত্রে ২.৪ শতাংশ। আবার চাকরি ও শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই হারের মধ্যে সমতা ফিরে আসার তথ্য সমীক্ষায় ধরা পড়েছে। বস্তুত বর্তমান সময়ে দেশে জনসংখ্যা স্থিতিশীলতার সূচকের নীচে ২.১ শতাংশ থেকে ২.০০ শতাংশ। হিন্দু-মুসলিম জনসংখ্যার শতাংশ হল যথাক্রমে ৭৯.৮ এবং ১৪.২ শতাংশ। কাজেই দেশটা সুদূর ভবিষ্যতেও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে রূপান্তরিত হবে না। এমতাবস্থায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবিশ্বাস জনমনে প্রতিষ্ঠা করা যে দেশের শাসক দলের লক্ষ্য সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবিশ্বাস জনমনে এমনভাবে প্রথিত করা হয়েছে যে দেশের যে কোনও অপরাধের দায় যেন শুধু মুসলিমদের। এই বাতাবরণ সৃষ্টি করা হয়েছে দেশের শাসক দল ও সংঘ পরিবারের হিন্দুত্ব কায়েম করার লক্ষ্যে। আবার হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মের মৌলবাদী শক্তি এমন বাতাবরণ সৃষ্টিতে বহুলাংশে দায়ী। কিন্তু এই পরিবেশ তৈরি হওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মুসলিম জনগণকে।
সামাজিক বিভাজন ও অবিশ্বাসের এমন উৎকট প্রকাশ দেশভাগের সময়কালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সম্প্রতি পার্কসার্কাসের একটি নামকরা মেয়েদের কলেজের ছাত্রী জানিয়েছেন যে, মুসলিম অধ্যুষিত এই এলাকা দিয়ে কলেজে যেতে আতঙ্কিত বোধ করে। কলেজের অন্য বন্ধুদেরও এই অনুভূতি সে জানিয়েছে। আর মুসলিমদের যে হিন্দু এলাকায় বাড়িভাড়া পেতে কিরকম নাজেহাল হতে হয় সে তথ্য কমবেশি সকলের জানা। বিষয়টি গভীর উদ্বেগের।
অর্থনৈতিক অভিঘাতটিও কম নয়। মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা মাংস বিক্রি ও রপ্তানিতে সরকারি বিধিনিষেধে শুধু মুসলমানেরা আর্থিক সংকটে পড়েছে তাই নয়, দেশের রপ্তানি বাণিজ্যেও গুরুতর প্রভাব পড়েছে। মাংস বাড়িতে রাখা বা গরু ব্যবসায়ীদের নিধন ও নির্যাতনের ঘটনাগুলি বহুজনেরই জানা। তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উল্লেখ খুব জরুরি।
উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের শিবলিঙ্গে জল ঢালার জন্য যে রাস্তা দিয়ে “কাঁওয়ার যাত্রা”র পুণ্যার্থীরা মাথায় জল যান সেই পথের সব ভোজনালয়গুলিকে মালিকের নামের ফলক সামনে ঝোলাতে বলে পুলিশ নির্দেশ দেয়। উদ্দেশ্য স্পষ্ট। প্রায় একমাস ধরে কয়েক কোটি তীর্থযাত্রীর চলাচল ও তাকে ঘিরে যে বিরাট অর্থনীতি তা থেকে মুসলমানদের বঞ্চিত করা। এমনই অনেক বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার কবলে বর্তমান ভারতের মুসলিম সমাজ।
এগুলি ঘটনাপ্রভাবের খন্ডচিত্র মাত্র। আমাদের রাজ্যে দেশভাগের পরে বড় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সংঘটিত হয়নি ঠিকই, কিন্তু উভয় সম্প্রদায়ের মৌলবাদী শক্তির দাপট কমে গেছে ভাবাটা ভুল। হিন্দুত্ববাদী শক্তি সারা দেশের মতো এই রাজ্যেও বেড়েছে। সকলেই জানেন যে, দেশের বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতায় দেশের শাসকদলের আস্থা কতটা পলকা। সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দখল করার কৌশল অবলম্বন করে চলেছেন। এর মোকাবিলা করতে রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস যে যে পথে হাঁটছেন তা ভ্রমাত্মক এবং তা আখেরে হিন্দুত্ববাদী শক্তিসঞ্চয়ের সহায়ক হবে।
হিন্দুত্ববাদী শক্তি যেভাবে মন্দির-মসজিদের রাজনীতি করে চলেছে তার বিকল্প কিন্তু নরম হিন্দুত্ব নয়। দেশের প্রশাসনিক প্রধানের রাম মন্দির উদ্বোধন বা ভোটপ্রচারের শেষে কন্যাকুমারী থেকে তাঁর ধ্যানরত ছবি প্রচার দেশের সংবিধান অনুসারে গর্হিত। এর বিপরীতে অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য সেই ধর্মের আচার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সেই ধর্মের আচারে সামিল হওয়া রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের গুরুদায়িত্বের সঙ্গে একেবারে বেমানান। ঈদের সমাবেশে হাজির থেকে মুসলিমদের পাশে থাকার আহ্বান জানানো বা রাম মন্দিরের পাল্টা সরকারি ব্যয়ে জগন্নাথ মন্দির নির্মাণকে একে পরধর্ম সহিষ্ণুতা বলে না। বরং একে ধর্ম নিয়ে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা হিসেবে চিহ্নিত করাই যুক্তিযুক্ত হবে। দুই প্রশাসনিক প্রধানের ক্রিয়াকলাপ শুধু সংবিধানবিরোধী তাই নয় এগুলি দেশের বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী।
প্রশ্ন তোলা যায়, দুই সরকারই যদি ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে তবে পশ্চিমবাংলার মুসলিম সমাজ প্রায় সমষ্টিগতভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে কেন ভোট দান করেছে। মুসলিমদের পক্ষে বিজেপিকে সমর্থন করা হবে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কারণ দেশের বিজেপি নিয়ন্ত্রিত সরকার ও তাদের পথপ্রদর্শক সংঘপরিবার মুসলমানদের বহিরাগত মনে করে এবং তাদের ভারতীয় নাগরিকের অধিকার পাওয়ার যোগ্য মনে করে না।
তৃণমূল নেত্রী বিষয়টি সম্যকভাবে অবহিত। তাই রাজ্যে শাসন টিকিয়ে রাখতে তাঁর প্রধান বাজি হল ৩২ শতাংশ মুসলিম ভোটের সিংহভাগ দখলে রাখা, আর নরম হিন্দুত্ব বজায় রাখা। এই দুই কৌশলে তিনি নির্বাচনে বাজিমাত করছেন। তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়া বিজেপির বিকল্প অন্য দল না থাকায় মুসলিমদের কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের অনুকূলে সমষ্টিগতভাবে ভোট দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। নিরাপত্তা ও জীবিকার স্বার্থে বাম গণতান্ত্রিক শক্তির দৃশ্যমান আন্দোলনের উত্থান ছাড়া মুসলিমদের বর্তমান অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
এই দুই কৌশলে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতা দখল করে চলেছেন এবং পশ্চিমবাংলার মুসলিমেরা এই শাসনে নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন বলে মনে করেন। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে যে, এই কৌশল অবলম্বন করে বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের জয় কত সময় স্থায়ী থাকবে। বিজেপি সারা ভারতে আধিপত্য কায়েম করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। পশ্চিমবাংলা দখল তাদের পাখির চোখ। এই লক্ষ্যে তারা মুসলিম প্রধান মালদহ ও মুর্শিদাবাদকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিহারের কয়েকটি জেলার সঙ্গে যুক্ত করে আলাদা রাজ্যের দাবি খোদ সংসদে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের আলাদা মর্যাদার দাবি করা হচ্ছে। এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দাবি যে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রকল্পগুলির আর্থিক সুবিধা পেতে ওই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
সঠিক দিশা ছাড়া বিজেপিকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। তৃণমূল কংগ্রেস কতদিন এমন গোঁজামিল দিয়ে শাসন কায়েম রাখতে পারবে তা সময়ই বলবে। তাই তৃণমূল কংগ্রেসের আশ্রয়ে মুসলিমরা কত দিন সুরক্ষিত তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন এক সাধারণ কর্মসূচির ভিত্তিতে বিজেপির বিরুদ্ধে বাম গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ লড়াই। যে ইন্ডিয়া জোট তৈরি হওয়ার ফলে বিজেপির ঔদ্ধত্য অনেকাংশে কমানো সম্ভব হয়েছে, সেই জোট যদি সাধারণ কর্মসূচির ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণতন্ত্র রক্ষার লড়াই জারি রাখতে পারে তবেই মুসলিমসহ সব সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।