বামপন্থা ও গণতন্ত্রের কথোপকথন
[রাজ্য]
বাংলা তথা ভারতের লুন্ঠিত সম্পদ ব্যবহার করেই একদিন ব্রিটিশরা বিশ্বের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। আর আজ ভারতের মোট সম্পদের তিন চতুর্থাংশ সম্পদের উপর দখলদারি কায়েম করেছে বৃহৎ শিল্পপতিরা। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানুষের শ্রম লুণ্ঠন করেই তাদের সম্পদের পাহাড়। যন্ত্রণাক্লিষ্ট দেশবাসীর প্রতিবাদ আন্দোলনকে মোকাবিলা করতে সেদিন ব্রিটিশ শাসকরা বিভেদের নীতি অনুসরণ করেছিল। আজ সেই একই বিভেদের নীতি অনুসরণ করছে ভারতের শাসকরা। সর্বোচ্চ মুনাফার জন্য বৃহৎ শিল্প-বাণিজ্য গোষ্ঠীগুলি শাসক বিজেপি সরকারের পেছনে দাঁড়াচ্ছে। ফলশ্রুতিতে মাত্র ১ শতাংশ ধনকুবেরের হাতে দেশের মোট সম্পদের ৪০ শতাংশ কুক্ষিগত হয়েছে। ১০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণে দেশের ৭৫ শতাংশ সম্পদ। বিপরীতে, ভারতের ৭৫ শতাংশ মানুষের জীবন যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট। আমাদের গর্বের প্রতিবাদী বাংলা বর্তমান শাসকদের অপকর্মে আজ সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও দুর্নীতিতে কলঙ্কিত।
এখন অবাধ মুনাফার জন্য বড় পুঁজিপতিদের লোলুপ দৃষ্টি কৃষি ক্ষেত্র, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সস্তা শ্রম সম্পদের দিকে। জমি চাষের উপকরণ ও কৃষি পণ্যের বিপুল ব্যবসাও তাদের লক্ষ্য। রাষ্ট্রও তাদের লক্ষ্য পূরণে বিশেষভাবে তৎপর। বর্তমানে ইউরোপ-আমেরিকায় কৃষক সংখ্যা নগণ্য। সেখানে কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদ করতে ২০০ বছরের বেশি সময় লেগেছিল। ভারতের কর্পোরেট গোষ্ঠীরা সরকারের সহযোগিতা নিয়ে অতি দ্রুত সে কাজ সম্পন্ন করতে চায়।
বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে এদেশে কৃষি সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। উৎপাদন শ্লথ হয়ে পড়ে। শুরু হয় কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের আত্মহত্যা। বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে বৃহৎ মালিকদের জন্য সরকার শুরু করে জমি অধিগ্রহণ। তার প্রতিবাদে কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠে দেশের প্রায় সমস্ত প্রান্তে। সেসময় ইউপিএ সরকার বাধ্য হয়ে সমস্ত দলের সঙ্গে আলোচনা করে ২০১৩ সালে ব্রিটিশ আমলের জমি অধিগ্রহণ আইন পরিবর্তন করে সংশোধিত জমি অধিগ্রহণ আইন প্রণয়ন করে।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেই বিজেপি সরকার সংশোধিত জমি অধিগ্রহণ আইনটি বাতিল করতে তিন বার অর্ডিন্যান্স জারি করে। এরপর করোনা মহামারির সুযোগ নিয়ে চালু করা হয় তিনটি কৃষি আইন।
তিনটি কৃষি আইনের প্রতিবাদে দেশব্যাপী কৃষকরা আন্দোলনে নামেন। এক বছরের বেশি সময় ধরে রাজধানী দিল্লি ঘেরাও করে রাখেন পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলির কৃষকরা। দেশের সমস্ত প্রান্ত থেকে কৃষকরা এসে সমর্থন জানান। সরকার বাধ্য হয় ওই তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে। কিন্তু রাষ্ট্র এবং বৃহৎ পুঁজি লক্ষ্যে স্থির থেকে রাজ্য রাজ্যে আইন সংশোধন করে এবং নতুন মার্কেটিং আইন চালু করে। ২০১৪ সনেই আমাদের রাজ্য সরকার সেই ধরনের আইন পাস করে। আজ সারা দেশের মতো এরাজ্যেও ছোট কৃষকরা ফসলের লাভজনক দাম তো দূরের কথা, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পাচ্ছে না। তা বেনামে কব্জা করে নিচ্ছে শাসক দলে নাম লেখানো ফড়ে এবং চালকল মালিকেরা। রাজ্যের শাসকদের দুর্নীতিকে অজুহাত করে কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে ১০০ দিনের কাজের জন্য বরাদ্দ। কাজ করেও বকেয়া মজুরি পাচ্ছে না গ্রামের মজুররা।
দীর্ঘ শ্রমিক আন্দোলনের চাপে কাজের নিরাপত্তা, কাজের সময়, ন্যূনতম মজুরি, আন্দোলনের অধিকারসহ যে অধিকারগুলি প্রচলিত শ্রম আইনগুলিতে ছিল, তা বাতিল করে চালু করা হয়েছে চারটি শ্রম কোড। শ্রমিকের সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে মালিকের দাস বানাবার নগ্ন ভূমিকায় সরকার। তবে আন্দোলন বন্ধ করা যায়নি। স্যামসাঙ এর মতো বহুজাতিক সংস্থাও শ্রমিক আন্দোলনের চাপে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে। রাজ্যে রাজ্যে বিদ্যুৎ সংস্থাগুলি বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে তীব্র শ্রমিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রম কোড বাতিল ও শ্রমিকদের অধিকার হরনের বিরুদ্ধে সারা দেশের শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন ২০ মে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন দেশব্যাপী ধর্মঘট করার জন্য। কৃষক ক্ষেতমজুর সংগঠনগুলি ধর্মঘটের সমর্থনে কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন।
সাম্প্রতিক কালে শুধু আমাদের দেশে নয়, সমগ্র ইউরোপ-আমেরিকা কেঁপে উঠেছে শ্রমিক কৃষক আন্দোলনে। সেখানকার শাসকরা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলে রেহাই পাচ্ছে না। আমাদের দেশেও শাসকরা সাম্প্রদায়িক বিভেদের রাজনীতি করে শ্রমিক কৃষক মেহনতী মানুষের আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।
তবে শুধু প্রচার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঐক্য গড়ে ওঠে না। শ্রমজীবী শ্রেণীগুলির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রেণী ঐক্য বিকশিত হয়। তেভাগা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা — সংগ্রামের কেন্দ্রগুলিতে কোথাও দাঙ্গা বাধানোর চক্রান্ত সফল হয়নি। মনে রাখতে হবে, সরকার ও জমিদারদের পরিকল্পিত দাঙ্গা বাঁধানো চক্রান্ত মোকাবেলা করেই এই আন্দোলন তীব্রতা লাভ করেছিল।
সাম্প্রতিককালে শ্রমজীবী শ্রেণীগুলির আন্দোলনে পারস্পরিক সহায়তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনে সামিল হয় বিভিন্ন মতাদর্শ ও রাজনৈতিক মতামতের অসংখ্য কৃষক সংগঠন। কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে দাঁড়ায় শ্রমিক সংগঠনগুলি। আন্দোলনে সামিল হয় ছাত্র যুব মহিলা সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরা। এর ফলের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। প্রলোভন দেখিয়ে এবং হাজারো দমনপীড়ন নামিয়েও কৃষক আন্দোলনকে ভাঙা যায়নি। পিছু হটতে বাধ্য হয় সরকার।
আন্দোলনের এই নতুন বাস্তবতা শাসকদের চিন্তিত করে। সে কারণে রাষ্ট্র তার আইনসমূহকে আরো কঠোর করে তুলছে। দেশের সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মূল কাঠামোকেই আক্রমণ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রতিহিংসা নেওয়া হচ্ছে প্রতিবাদীদের উপর। নির্বাচন কমিশন থেকে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করছে সরকার।
এ রাজ্যেও আন্দোলনের নতুন বাস্তবতা লক্ষ্য করা গেছে সম্প্রতি আরজিকর হাসপাতালে চিকিৎসক কন্যার ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনে। জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন সিনিয়ররা — আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ছাত্র যুব মহিলা শিল্পী বুদ্ধিজীবী অসংখ্য মানুষ। এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শহরের মানুষের অংশগ্রহণের প্রবণতা শাসকদেরকে শঙ্কিত করেছে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়েছে রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির ব্যাপক দুর্নীতি ও ওষুধ নিয়ে জালিয়াতির কথা।
কয়েক বছর ধরে বঞ্চিত অথচ যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীরা শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আন্দোলন চালাচ্ছিলেন। যোগ্য প্রার্থীরা চাকরি পাননি। কিন্তু লক্ষ লক্ষ টাকা উৎকোচ দিয়ে অযোগ্য প্রার্থী চাকরি পেয়ে গেছেন। হাইকোর্টের রায়ে সিবিআই ইডি তদন্ত নেমেছে। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে শিক্ষা নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়িত মন্ত্রী আধিকারিকদের কোনও শাস্তি হয়নি। ইতিমধ্যে মন্ত্রী ছাড়া প্রায় সবাই জামিন পেয়ে গেছেন। সরকার যোগ্য ও অযোগ্যদের তালিকা দিতে না পারায় ব্যাপক দুর্নীতির কারণে সুপ্রিম কোর্ট গোটা প্যানেলকে বাতিল করেছেন। ফলে ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সভা করে ‘কারও চাকরি যাবে না’ ঘোষণা করলেও চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীরা আশ্বস্ত হতে পারেননি। মরিয়া হয়ে তারা চাকরি বাঁচাতে এসএসসি ও মধ্যশিক্ষা পর্ষদের অফিসের সামনে লাগাতার অবস্থান-বিক্ষোভ ও অনশন চালাচ্ছেন। চাকরিহারাদের আন্দোলন কার্যত বিদ্রোহ হয়ে উঠেছে।
এক সময়ে কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, কর্মসংস্থানে, সারা দেশের মধ্যে অন্যতম অগ্রগণ্য পশ্চিমবাংলায় আজ কাজ নেই। লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতী পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে অন্য রাজ্যে কাজের জন্য চলে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীদের মর্যাদা ও সুরক্ষার অবনতি, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদের পারস্পরিক সাম্প্রদায়িক জিগিরে এই রাজ্যের মর্যাদা ধুলায় লুন্ঠিত। এর মধ্যে মুর্শিদাবাদের সুতি, শমসেরগঞ্জের, ধুলিয়ানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় খুন হয়েছে বামপন্থী পরিবারের বাবা-ছেলে এবং একজন হতভাগ্য মুসলমান যুবক। শাসক দলগুলির সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং প্রশ্রয়ে দুষ্কৃতিরা মানুষকে হত্যা, ঘর-বাড়ি জ্বালানো, লুঠপাটের দুঃসাহস দেখাতে পেরেছে। রাজ্য সরকার ও পুলিশ-প্রশাসন দাঙ্গা ঠেকাতে প্রথম থেকে যথেষ্ট তৎপর হয়নি। পুলিশ-প্রশাসন প্রথম থেকে তৎপর হলে এতটা ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যেত। কেন্দ্রের শাসক দল এই ঘটনা নিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক প্রচার চালাচ্ছে। বলা হচ্ছে, বাবা-ছেলে সিপিআইএম করে বলে খুন হননি, হিন্দু বলে খুন হয়েছেন। বামপন্থী হিসেবে তাঁরা ওই এলাকায় হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষার পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিতেন বলেই তাঁরা হিন্দু-মুসলমান উভয় মৌলবাদীদের চক্ষুশূল ছিলেন। কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তীব্র নিন্দা করেও বলা করা যায়, এরপর সারা দেশের মতো এরাজ্যেও উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক প্রচার তীব্র হবে।
এর মধ্যে বৈশাখের তীব্র দাবদাহের মধ্যে কৃষক, শ্রমিক, ক্ষেতমজুর, বস্তি সংগঠনের ব্রিগেড সমাবেশে কয়েক লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের সমাগম নিঃসন্দেহে সাম্প্রদায়িক জিগিরের বিরুদ্ধে পশ্চিমবাংলায় বামপন্থা ও গণতন্ত্রের পরিসর গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। শ্রমজীবী মানুষের রুটি-রুজি, কাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীদের নিরাপত্তা ও অধিকার সহ জনজীবনের প্রতিটি যন্ত্রণা নিয়ে লাগাতার দৈনন্দীন সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করাই বামপন্থীদের কাজ। তরুণ প্রজন্মের সাথীরাই এই কাজে অগ্রদূতের ভুমিকা পালন করতে পারেন।